পুরনো ভবিষ্যৎ

“তুমি টাইম ট্রাভেল করে আইন্সটাইনের সাথে দেখা করতে চাচ্ছো?”
জিজ্ঞেস করলেন বিজ্ঞান একাডেমির সর্বেসর্বা আর্থার লুইস। তার সামনে একটি গ্রানাইট পাথরের টেবিল। টেবিলের ওপাশে বসে আছে তরুণ পদার্থ বিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট। সে প্রশ্নের জবাব দিলো না। শান্ত চোখে আর্থার লুইসের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আর্থার বললেন, “প্রশ্নটা আমি তোমাকেই করেছি জন। তুমি এই জাতীয় কিছু কি আসলেই ভাবছো?”
“জ্বি মহামান্য আর্থার।” মাথা নিচু করে জবাব দিল জন স্টুয়ার্ট। আর্থার বিস্মিত না হয়ে পারলেন না। জন স্টুয়ার্ট বিজ্ঞানী হিসেবে প্রথম শ্রেণির এতে কোন সন্দেহ নেই। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই সে ষষ্ঠ মাত্রার যে সমীকরণটি দাঁড় করিয়েছে তা ছিলো রীতিমতো অবিশ্বাস্য। তাছাড়া দশম জেনারেশনের কম্পিউটার- ‘ম্যাক্সডি’ তৈরির সময়ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে এই তরুণ বিজ্ঞানী। তার মেধা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা সমীচীন হবে না। তাই বলে সে এ ধরনের কোন পরিকল্পনা করে বসে থাকবে আর্থার লুইস কল্পনাও করতে পারেননি।
আর্থার বললেন, “তুমি খুব ভালো করেই জানো – টাইম ট্রাভেল এখনো কাগজে কলমেই সম্ভব। আমাদের কাছে সেই প্রযুক্তি এখনো নেই যা দিয়ে আমরা টাইম ট্রাভেল করতে পারি।”
“আছে স্যার।”
“কী বললে তুমি?”
“বললাম টাইম ট্রাভেল করার মতো প্রযুক্তি আমাদের আছে। মানুষ চাইলে এখনই টাইম ট্রাভেল করতে পারবে।”
আর্থার যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। এই কথাগুলো জন স্টুয়ার্ট না বলে অন্য কেউ বললে সাথে সাথেই তিনি রেগে যেতেন। বিজ্ঞান কোন ছেলে খেলা নয়। যে কেউ যা ইচ্ছা তা বলতে পারে না। তবে জন স্টুয়ার্ট যখন বলেছে- বাধ্য হয়েই তাকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
“বুঝিয়ে বলো। এখন টাইম ট্রাভেল কীভাবে সম্ভব? আলোর বেগে ছুটে চলার জন্য কোন যানবাহনের যে পরিমাণ জ্বালানী, শক্তি দরকার- তা আমরা পাবো কোথায়?এই পরিমাণ শক্তির উৎস কোথায় আমাদের?”
“ব্ল্যাকহোল।” ছোট করে জবাব দিল জন স্টুয়ার্ট।
“ব্ল্যাকহোল? তুমি কি আমার সাথে রসিকতা করার চেষ্টা করছো? তুমি জানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রসিকতা করা তৃতীয় মাত্রার অপরাধ।” চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন আর্থার।
“মহামান্য আর্থার আপনার সাথে আমি রসিকতা করছি না। যা বলছি ভেবেই বলছি।”
“তুমি ভালো করেই জানো যে একটা ব্ল্যাকহোল তার চেয়ে বড় নক্ষত্রকেও চকোলেটের মতো শুষে খেয়ে ফেলতে পারে। লক্ষ কিলোমিটার দূরের মহাকাশযানও ব্ল্যাকহোলের টানে কাঁপতে থাকে। সেই ব্ল্যাকহোলের শক্তিকে তুমি ব্যাবহার করতে চাচ্ছো?”
“জি মহামান্য আর্থার। তবে আমি প্রাকৃতিক ব্ল্যাকহোলের কথা বলছি না। আমরা চাইলে একটা কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরি করতে পারি। যেহেতু ব্ল্যাকহোলটি প্রাকৃতিক হবে না সেক্ষেত্রে আমরা তার শক্তিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো এবং সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে টাইম ট্রাভেল করা সম্ভব।”
আর্থার লুইস বিস্ময় গোপন করতে পারলেন না। গোপন করার চেষ্টাও করলেন না তিনি। কাপা কাপা ঠোঁটে উচ্চারণ করলেন, “কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল! তুমি কী বলছো এসব? এটা কী করে সম্ভব?”
“ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক-অ্যানার্জি এবং কৃত্রিম গ্রাভিটি সবকিছু একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় রেখে আমরা দুটো রকেট ছুড়ে দেবো। সতেরো কিলোমিটার দূরে গিয়ে রকেটদুটো একে অপরকে আঘাত করবে। সেই বিস্ফোরণেই সৃষ্টি হবে কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল। যার টান অসীম হবে না। সেই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই বিশেষ ধরনের ক্যাপসুল ছুড়ে দেয়া হবে। মানুষ বহন করতে সক্ষম সেই ক্যাপসুলের গতিবেগ হবে প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি। ক্যাপসুলটা বর্তমান থেকে যাত্রা করে পৌঁছে যাবে অতীতে।”
“কিন্তু তুমি অতীত থেকে ফিরবে কিভাবে? সেই সময়ে নিশ্চয়ই তুমি এই প্রযুক্তি পাবে না। তখন তুমি রকেটের বিস্ফোরণ ঘটাবে কিভাবে?”
“স্যার একটি কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল থেকে যে পরিমাণ এনার্জি উৎপাদন হবে তা দিয়ে একবার অতীতে গিয়ে আবার ফিরে আসা যাবে। ক্যাপসুলেই এনার্জি মজুদ রাখার ব্যাবস্থা করা হবে। শুধু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যেন অতীতে পৌছে ক্যাপসুলটি অক্ষত অবস্থায় থাকে।”
আর্থার লুইস বড় বড় চোখ করে জন স্টুয়ার্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ঘোর লাগা ভাব শেষ হওয়ার আগেই এক টুকরো কাগজ বের করল জন। টেবিলের উপর কাগজের টুকরোটা মেলে ধরে বলল, “দেখুন স্যার।”
আর্থার দ্রুত চোখ বুলালেন। কাগজ জুড়ে সেই কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরির ফর্মুলা লিখা হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকবার সমীকরণটা দেখলেন। অবিশ্বাস্য! এতে কোন ভুল নেই!
“কিন্তু জন তুমি তো জানোই সমীকরণ দাঁড় করানোর চেয়ে তার বাস্তবিক প্রয়োগ করাটা অনেক বেশি কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। এখনই তো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে এই সমীকরণ ব্যাবহার করে কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরি করা সম্ভব। শুধুমাত্র সম্ভাবনা আছে।”
“আমি নিশ্চিত ভাবেই বলছি। এটি সম্ভব।”
“তুমি কিভাবে এতটা নিশ্চিত হচ্ছো?”
“স্যার, আমি…..” জন স্টুয়ার্ট কথা শেষ করল না। মাথা নিচু করে আমতা আমতা করতে লাগলো।
“কথা শেষ করো জন। তুমি কী..?”
“স্যার, আমি ইতিমধ্যেই একবার কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরি করেছি।”
এবারে আর্থার লুইসের বিস্ময় সীমা অতিক্রম হলো।
“তুমি কখন করলে এই এক্সপেরিমেন্ট? কোথায় করলে?” জানতে চাইলেন তিনি।
“ম্যাক্সিন গ্রহে থাকাকালীন করেছি। ওদের কিছু রোবট আমাকে সাহায্য করেছে। আপনাকে আগে না জানানোর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।”
আর্থার লুইসের কিছুটা মন খারাপ হলো। এই ছেলেটাকে তিনি নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করেন। সে এত বড় একটা আবিস্কার করে ফেলেছে, অন্তত তাকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি।
“তো তুমি এখন আমাকে জানালে কেন? চুপিচুপি একটা ব্ল্যাকহোল তৈরি করে তো টাইম ট্রাভেল করতে পারতে।” তার গলায় অভিমানের ছাপ স্পষ্ট।
“স্যার, আমি আবারও দুঃখিত আপনাকে না জানিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য। কিন্তু আপনার অনুমতি ছাড়া আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে কখনো কিছু করিনি, আর করবোও না।”
এই জবাবে কিছুটা খুশি হলেও তা বুঝতে দিলেন না আর্থার। তিনি গলার স্বর অপরিবর্তিত রেখেই বললেন, “আচ্ছা আইন্সটাইনের সাথে দেখা করার ইচ্ছা হলো কেন তোমার?”
“স্যার দুটো কারণে আমি তার সাথে দেখা করতে চাই। প্রথমত আমি তার একনিষ্ঠ ভক্ত। তাকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা, তার সাথে কথা বলতে পারার সৌভাগ্য- আমাকে এই কাজে উৎসাহ জুগিয়েছে।“
“আর দ্বিতীয় কারণ?”
“আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা বন্ধ করতে চাই স্যার।” শান্ত কন্ঠে বলল জন স্টুয়ার্ট।
“আইন্সটাইন চাইলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে?”
“উনার অনুরোধ কেউ ফেলতে পারবে না বলে আমি মনে করি।”
“কিন্তু একটা ঘটে যাওয়া অতীতকে তুমি কিভাবে পরিবর্তন করতে চাচ্ছো? এতে প্রকৃতির মাত্রা ভেঙে যাবে। তা প্রকৃতি কখনোই সহজ ভাবে নেবে না। বড় ধরনের কোন বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে।”
এবারে জন স্টুয়ার্ট তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারল না। এই সম্ভাবনার কথা সে নিজেও জানে। তবু সে একটা চেষ্টা করবে। পৃথিবীর ইতিহাসের কলুষিত এক অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সে এই ইতিহাস বদলে দিতে চায়।
“সেই সম্ভাবনা আছে তা আমি জানি স্যার। তবে আমার সমীকরণ অনুযায়ী আমি যদি অতীতের কাজ শেষ করে পুনরায় ভবিষ্যতের একই মুহুর্তে ফিরে আসতে পারি সেক্ষেত্রে কোন ধরনের বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা নেই।”
“একই মুহুর্তে বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছো?”
“স্যার, এখন ৩০২৯ সাল চলছে। মনে করুন, আমি আজকের এই দিনে টাইম ট্রাভেল করে অতীতে চলে গেলাম। তারপর সেখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে আবার যদি আজকের এই দিনটাতেই ফিরে আসি সেক্ষেত্রে প্রকৃতির নিয়ম ভাঙার সম্ভাবনা কমে যাবে। আমি ফিরে এসে হয়তো দেখবো শুধু ইতিহাসটাই বদলে গেছে।”
জন স্টুয়ার্ট কী বোঝাতে চাচ্ছে তা আর্থার লুইস বেশ ভালো করেই জানেন। তবু তার মনে নানা শঙ্কা উঁকি দিয়ে গেল।
“আমি তোমাকে বাঁধা দেবো না। কিন্তু তুমি চাইলে আরও একবার ভেবে দেখতে পারো। প্রকৃতি অনিয়ম সহ্য করবে বলে আমার মনে হয় না।” কথাটা শেষ করেই তিনি রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। জবাব শোনার জন্য অপেক্ষা করলেন না।

মেঘের উপর দিয়ে চলে গেছে রেইল লাইন। সম্পূর্ণ চৌম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে নির্মিত এই রেল ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম অর্জন।
ট্রেনের জানালা দিয়ে মেঘ দেখছিলো এডাম জেসিকা। তার ভাবতেই অবাক লাগছে এরকম দৃশ্য দেখার জন্য প্রাচীনকালে মানুষকে প্লেনে চড়তে হতো। অথচ এখন সবকিছু কত সহজ। ১০০ ইউনিট খরচ করলেই প্রাইভেট জেটে করে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসা যায়। খরচের পরিমাণ একটু বাড়ালেই চাঁদে ভ্রমণ করাও সম্ভব । খুব বেশি ধনী যারা তারা ছুটি কাটাতে চলে যাচ্ছে মঙ্গল গ্রহে। মানুষ এত দ্রুত উন্নতি করে ফেলছে যে কোন কিছুতেই এখন আর বিস্ময় বোধ জাগে না।
পায়ের নিচে সোনালী মেঘের আস্তরণ। ধোঁয়ার মতো কুন্ডলী পাকিয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছে মেঘেদের দল। এত চমৎকার দৃশ্য দেখেও জেসিকার মন ভালো হলো না। জন স্টুয়ার্ট আলতো করে জেসিকার কাঁধে হাত রাখলো। চমকে ফিরে তাকালো সে।
“তোমার এখনো মন খারাপ?”
জেসিকা জবাব দিল না। জন স্টুয়ার্ট অতীত ভ্রমণ করবে জানার পর থেকেই তার মন খারাপ। বিজ্ঞান একাডেমি থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে। কিছুদিন পরই জন স্টুয়ার্টের সাথে জেসিকার বিয়ে। সেই মানুষটা অতীতে চলে যাবে তা জেসিকা মেনে নিতে পারছে না। মানুষ এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ভ্রমণ করলেই প্রিয়জনের জন্য টান অনুভব করে। আর জন স্টুয়ার্ট চলে যাচ্ছে হাজার বৎসর আগের একটা সময়ে। স্বাভাবিক ভাবেই নানা দুশ্চিন্তা এসে ভর করছে মনে।
“তুমি এত মন খারাপ কেন করছো? তোমার তো আমার জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। আমি সেখানে সপ্তাহ খানেক থাকলেও ফিরে আসবো একই সময়ে। এখানে সময় প্রবাহিত হবে মাত্র কয়েক মিনিট। ৭-৮ মিনিটের ভেতরই আমি ফিরে আসবো।”
“তবু আমার ভয় করছে। সেই সময়ের মানুষ তোমাকে সহজ ভাবে নেবে কি-না কে জানে।”
“সমস্যা হবে না। আমি সেই সময়ের মানুষ সেজেই যাব। তখনকার সম্ভ্রান্ত মানুষেরা কালো কাপড়ের স্যুট পড়তো। গলায় ‘টাই’ নামক এক টুকরো লম্বা কাপড় ঝুলিয়ে রাখতো। আমি সেই ড্রেস পড়েই হাজির হবো সেখানে। কাজেই আমি যে ভবিষ্যতের মানুষ কেউ বুঝতে পারবে না।”
“আমি চাচ্ছিলাম কিছুদিন পর যাও তুমি। আমাদের বিয়েটা হয়ে যাক।”
“শোন, ঠিক করে রাখা দিনেই আমাদের বিয়ে হবে। বললাম তো আমি যাব ঠিক তার ১০ মিনিট পরই ফিরে আসবো।”
“তবুও….”
“উঁহু, আর কোন বাজে কথা না। অতীতে যাচ্ছি। তোমার জন্য কী আনবো বলো।”
“তোমার যা ইচ্ছা হয় আনলেই হবে। তুমি সুস্থ ভাবে ফিরে এলেই আমি খুশি।”
“তবু বলো। বিংশশতাব্দীর বিশেষ কিছু কি আছে যা তোমার ভালো লাগে?”
“আমি শুনেছি সেই সময়ে ‘গোলাপ’ নামক একটা ফুল পাওয়া যেত। মানুষ তাদের প্রিয়জনদের সেই ফুল দিয়ে প্রেম নিবেদন করতো। সম্ভব হলে আমার জন্য একটা গোলাপ ফুল নিয়ে এসো।” কথাগুলো বলার সময় জেসিকার গাল গোলাপি বর্ণ ধারণ করলো।
জন স্টুয়ার্ট হাসিমুখে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। তবে একটা গোলাপ আনবো না। আমার দুইহাতে যতগুলো গোলাপ আঁটে নিয়ে আসবো।”
জেসিকা আর কোন কথা বলল না। শক্ত করে জন স্টুয়ার্টের চুল ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। স্টুয়ার্ট বুঝতে পারল তার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

বিশালাকার হলরুমের মাঝে প্রজেক্টটি দাঁড় করানো হয়েছে। চলছে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জন স্টুয়ার্ট অতীত ভ্রমণে যাচ্ছে। বিষয়টা যতটা সম্ভব গোপন রাখা হলেও কয়েকটা টিভি চ্যানেলের লোক চলে এসেছে। মানব সভ্যতার উন্নয়নের যাত্রার আরও একটা নতুন দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে- এরকম একটা নিউজ কেউই হাতছাড়া করতে চাইছে না।
আর্থার লুইস সব কিছু দেখে নিলেন। সবকিছু বেশ স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। জন স্টুয়ার্ট ছোট ক্যাপসুলের ভেতর ঢুকে পড়লো। ক্যাপসুলের ঢাকনা লাগানোর ঠিক আগ মুহুর্তে একবার তাকালো দূরে বসে থাকা জেসিকার দিকে। জেসিকার চোখে জল থাকলেও সে হাসিমুখে স্টুয়ার্টকে বিদায় জানালো।
আর্থার টাইমার সেট করে নিলেন। জন স্টুয়ার্ট উপস্থিত হবে ১৯২৫ সালে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ বছর আগে। যাতে করে সহজেই এই যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ নেয়া যায়। সবকিছু দেখে নিয়ে তিনি সুইচ অন করলেন। সাথে সাথেই বিশালাকার হলরুমের উপরের খোলা অংশ দিয়ে দুটো রকেট ছুটে গেল উপরে দিকে। তার পিছু পিছুই ছুড়ে দেয়া হলো জন স্টুয়ার্টের ক্যাপসুলটিকে। বায়ুমন্ডলের বাইরে পৌছেই ক্যাপসুল থেকে সতেরো কিলোমিটার দূরে গিয়ে রকেট দু’টোর বিস্ফোরণ হলো। সাথে সাথেই সেখানে ছোট একটা কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরি হলো। ব্ল্যাকহোলটা ক্যাপসুলটিকে টেনে নিল নিজের কেন্দ্রের দিকে। কয়েক মুহুর্ত পড়েই ব্ল্যাকহোলটি মিলিয়ে গেলো শূণ্যে।
জন স্টুয়ার্টের মনে হলো সে কোন অতল গহবরে হারিয়ে যাচ্ছে। ক্যাপ্সুলের ভেতর অল্প আলো থাকলেও সে কিছুই দেখতে পেলো না। অন্ধকার যেন চোখ ফুটো করে মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। সে কোথায় আছে, কোথায় যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারল না। এ যেন এক অস্তিত্বহীনতার অস্তিত্ব। অবশ্য কয়েক মুহুর্ত পরই মনে হলো সব আগের মতো হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে চোখ মেললো সে। ক্যাপসুল খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো৷ পরিকল্পনা মাফিকই হয়েছে সবকিছু। একটা ছোট খাট জঙ্গলের ভেতর এসে তার ক্যাপসুলটি পড়েছে। হাতের ডিভাইস দেখে নিশ্চিত হলো এটা ১৯২৫ সাল। অচেনা অন্যরকম এক অনুভূতি ছুয়ে গেল তাকে। সে সত্যি সত্যি টাইম ট্রাভেল করতে পেরেছে।
জন স্টুয়ার্ট দেরি করলো না। দ্রুত কিছু গাছের ডাল-পালা দিয়ে ক্যাপসুলটিকে ঢেকে ফেললো। তারপর বন থেকে বেড়িয়েই শহরের দিকে পা বাড়ালো সে। একটা ডায়মন্ডের দোকানে ঢুকে নিজের ডায়মন্ডের আংটিটা বিক্রি করে দিলো। সে চাইলে এই সময়ের মূদ্রা বানিয়ে আনতে পারতো। কিন্তু তার নকল মূদ্রা ব্যাবহার করার ইচ্ছা ছিলো না।

সন্ধ্যে নামার আগেই জন স্টুয়ার্ট পৌছে গেল জার্মানির স্টেট অব প্রুশিয়াতে। এখানের একটা হলরুমেই আজ আইন্সটাইনের একটা সেমিনার হওয়ার কথা রয়েছে। হলরুমে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো তাকে। চওড়া কাঁধের এই অচেনা যুবকটিকে দেখে কেউ কেউ বেশ অবাক হলো। একে একে সবাই আসতে লাগলো হলরুমে। একসময় জন স্টুয়ার্ট অপার বিস্ময় নিয়ে আবিস্কার করলো তার সামনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পদার্থ বিজ্ঞানী স্বয়ং স্যার অ্যালবার্ট আইনস্টাইন দাঁড়িয়ে আছেন।

“তুমি বলতে চাচ্ছো যে তুমি ভবিষ্যৎ পৃথিবী থেকে আগত মানুষ?” চাপা স্বরে বললেন তিনি।
“জ্বি স্যার।” জবাব দিল জন স্টুয়ার্ট।
“ঠিক আছে বুঝলাম। কিন্তু তুমি এরকম নড়াচড়া করছো কেন? ভবিষ্যতের মানুষ কি শান্ত হয়ে বসতে জানে না? শান্ত হয়ে বসো। আইন্সটাইন ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ বুঝাচ্ছে, দেখো কিছু বুঝতে পারো কি-না।” বলেই তিনি মঞ্চের দিকে তাকালেন।
এই মানুষটার হাস্যকর সম্পর্কে জন স্টুয়ার্ট ভালো করেই জানে। কাজেই সে অবাক হলো না। ফিসফিস করে বলল, “ স্যার, আমি যে আপনার পাশাপাশি বসে আছি এটা আমার জন্য অস্বস্তিকর। সেমিনার শুরু হয়ে গেছে। নইলে আমি দাঁড়িয়ে কথা বলতাম। আপনার পাশাপাশি বসার যোগ্যতা আমার নেই।”
“আপনি আমাকে স্যার বলছেন কেন? আমাকে এতটা সম্মান দেয়ার কিছু নেই। আমি আইন্সটাইনের গাড়ির ড্রাইভার মাত্র।”
“স্যার আমি জানি আপনিই জগৎ খ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। যে বক্তৃতা দিচ্ছে- সে আপনার ড্রাইভার।”
এ কথায় আইন্সটাইন ভীষণ অবাক হলেন। এখানের কেউই তাকে চিনে না। সেজন্য মজা করার জন্য তিনি তার ড্রাইভারকে মঞ্চে তুলে দিয়েছেন বক্তৃতা দেয়ার জন্য। তাহলে এই যুবক তাকে কিভাবে চিনতে পারলো।
“তুমি আমাকে কিভাবে চেন?” শেষমেশ বলেই ফেললেন তিনি।
জন স্টুয়ার্ট বলল, “স্যার, আমি আসলেই ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি। আজ আপনি বক্তৃতা না দিয়ে আপনার ড্রাইভারকে মঞ্চে তুলে দেবেন এই ঘটনা আমি ইতিহাস থেকে জেনেছি। আপনি চাইলে আমি এটা প্রমাণ করে দেখাতে পারি।”
আইন্সটাইন কিছু বললেন না। শীতল চোখে তাকিয়ে রইলেন। জন স্টুয়ার্ট বলল, “কিছুক্ষণ পর এক ব্যাক্তি আপনার ড্রাইভারকে ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ নিয়ে এমন এক প্রশ্ন করবে যার উত্তর সে জানে না। সে তখন আপনাকে দেখিয়ে বলবে- আমার ড্রাইভারই এর জবাব জানে।”
আইন্সটাইন এবারে অবাক হলেন না। ছেলেটার চালাকি ধরে ফেললেন। হয়তো সে কাউকে দিয়ে কঠিন কোন প্রশ্ন করাবে।

কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই এই ঘটনাটি ঘটল। আইন্সটাইন ড্রাইভার সেজে সেই প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন।
জন স্টুয়ার্ট বললেন, “স্যার আপনি হয়তো বিশ্বাস করছেন না। এই দেখুন আপনার ভবিষ্যতে তোলা ছবি আমার ডিভাইসে আছে।”
নিজের জিব বের করা ছবি দেখে আইন্সটাইন অবাক হলেন। কারণ তিনি তখনও জিব বের করে ছবিটি তুলেননি। কিন্তু সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করতে করতে তাকে বিরক্ত করে ফেলে তখন প্রায়ই তার ইচ্ছে হয় জিব বের করে দেখাবেন। তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? এই ছেলেটা কি আসলেই সত্যি কথা বলছে!

সন্ধ্যায় পার্টি ডাকা হলো। জন স্টুয়ার্ট আইন্সটাইনের পিছু পিছু ঘুরতে লাগলো। আইন্সটাইন ধাঁধায় পড়ে গেলেন। তার একবার ইচ্ছে করল ছেলেটাকে তাড়িয়ে দেবেন। সেধে উটকো ঝামেলা মাথায় নেয়ার কোন মানে হয় না। কিন্তু শেষমেশ তিনি তা করতে পারলেন না। তিনি বাসায় ফিরলেন জন স্টুয়ার্টকে সাথে নিয়ে। জন স্টুয়ার্টের কয়েকটা চুল নিলেন তিনি। আঙুল ফুটো করে রক্ত নিলেন কয়েক ফোঁটা। তিনি ছেলেটার বয়স নির্ণয় করবেন। এতেই প্রমাণ হয়ে যাবে সে আসলেই ভবিষ্যতের মানুষ কি-না।
জন স্টুয়ার্ট মুগ্ধ হয়ে তার কাজ দেখতে লাগলো। বলা বাহুল্য সেই সময়ের প্রযুক্তি এতটা উন্নত ছিলো না। একটা অণুবীক্ষণযন্ত্র আর কিছু তরঙ্গ ব্যবহার করে এত দ্রুত কারো বয়স বের করে ফেলা যায় জন স্টুয়ার্টের জানা ছিলো না।
‘স্যার, আপনি যে বাড়িতে এভাবে বয়স নির্ণয় করার যন্ত্র বানিয়ে রেখেছেন এটা কিন্তু আমি জানি না। ইতিহাসের বইতে এটা ছিল না।’
‘কিছু কিছু কাজে আমার গোপনীয়তা পছন্দ।’ মাথা না তুলেই জবাব দিলেন আইন্সটাইন। তিনি কাজে ডুবে আছেন।

জন স্টুয়ার্টের বয়স বের করার পর আইন্সটাইন দীর্ঘসময় নির্বাক রইলেন। তার হিসেব অনুযায়ী ছেলেটার বয়স দেখাচ্ছে মাইনাস এগারো’শো চার (-১১০৪)। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ছেলেটা এগারো’শো চার বছর অতীতে চলে এসেছে।
“তুমি ৩০২৯ সাল থেকে এসেছো?” বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আইন্সটাইন।
“জ্বি স্যার। আমি শুরু থেকেই সত্য বলছি।”
“হুম” ছোট করে জবাব দিলেন আইন্সটাইন।
বেশ কিছু সময় তিনি কোন কথা বললেন না। তারপর বললেন, “ভবিষ্যতে তাহলে আলোর গতিতে চলার মতো প্রযুক্তি আবিস্কৃত হয়ে গেছে।”
“জ্বি স্যার। আমি নিজেই আবিস্কার করেছি।” লজ্জিত গলায় বলল স্টুয়ার্ট।

জন স্টুয়ার্ট একে একে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীদের বিজয়যাত্রার গল্প বলে যেতে লাগলো। তার ডিভাইসে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ধারণ করা ত্রিমাত্রিক ভিডিও দেখে আইন্সটাইন অবাক না হয়ে পারলেন না। এত উন্নতি! এ যেন কল্পনারও অতীত।
সবশেষে জন স্টুয়ার্ট কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরি এবং টাইম ট্রাভেলের বিষয়টা ব্যাখ্যা করল। তারপর সেই সমীকরণটা মেলে ধরল বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী মানুষটার সামনে। আইন্সটাইন দীর্ঘ সময় সমীকরণটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
জন স্টুয়ার্টের হৃদপিণ্ড কাঁপতে লাগলো। স্যার কি কোন ভুল খুঁজে পাবে এই সমীকরণে। আর্থার লুইস কোন ভুল পাননি। সেক্ষেত্রে সমীকরণটি ত্রুটিমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
“অবিশ্বাস্য! তুমি নিজেও খুব বড় একজন বিজ্ঞানী!” হাসিমুখে বললেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। হাফ ছেড়ে বাঁচল জন স্টুয়ার্ট।
“স্যার এই সমীকরণে তাহলে কোন ভুল নেই?” সাহস করে প্রশ্ন করে ফেলল সে।
এবারে আইন্সটাইনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি থমথমে গলায় বললেন, “নাহ, গাণিতিক দিক থেকে এতে কোন ভুল নেই। কিন্তু এর বিপরীতে যাওয়ার মতো খুব বড় একটা হাইপোথিসিস রয়ে গেছে। এতে করে প্রকৃতির কিছু পরিবর্তন ঘটবে।”
“স্যার যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন।” ভেতরে ভেতরে ভয় কাজ করলেও শান্ত থেকে বলল জন স্টুয়ার্ট।
আইন্সটাইন ব্যাখ্যা করা শুরু করলেন, “তুমি যখন ভবিষ্যতে ছিলে তোমার একটা নির্দিষ্ট ভর ছিলো প্রকৃতিতে। তুমি যখন ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে চলে আসলে তোমার ভর ভবিষ্যৎ থেকে ভ্যানিশ হয়ে গেলো। যেহেতু মহাবিশ্বের মোট ভর সর্বদা সমান, তোমার কি মনে হয় না এতে প্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে?”
জন স্টুয়ার্ট চুপ করে রইলো। এই সম্ভাবনার কথা আসলেই তার মাথায় আসেনি। আইন্সটাইন যোগ করলেন, “অতীতে এসে তুমি আরও একবার ভরের পরিমাণ নষ্ট করে দিচ্ছো। কারণ তুমি এসেছো ১৯২৫ সালে। এই সময়ে তোমার জন্মই হয়নি। তুমি এখন ভবিষ্যৎ থেকে এসে অতিরিক্ত একটা ভর তৈরি করছো এখানে।”
“এর ফল স্বরূপ কী ঘটতে পারে স্যার?” জন স্টুয়ার্ট উৎকন্ঠা গোপন করতে পারল না।
আইন্সটাইন বললেন, “ঠিক কী হবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তুমি যেই পরিমাণ ভর নষ্ট করেছো মহাবিশ্ব থেকে সেই পরিমাণ ভর বিলীন হয়ে যেতে পারে। ভেবো না শুধু তোমার ভরের কথা বলছি। ১৯২৫ সাল থেকে ৩০২৯ সাল পর্যন্ত মোট ভরের একটা পরিবর্তন আসতে পারে। এই পরিমাণ ভরের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছোট খাট কোন গ্রহ হারিয়ে যেতে পারে মহাবিশ্ব থেকে। তবে এই সম্ভাবনা কম। অন্য একটা সম্ভাবনা আছে যেটা বেশ জোরালো। সেটি হচ্ছে….”
আইন্সটাইন কথা শেষ করলেন না। কী মনে করে থেমে গেলেন।
জন স্টুয়ার্ট বলল, “স্যার আপনি কি সময়ের ফাঁদের কথা বলছেন?”
আইন্সটাইন এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। মৃদু হাসলেন। জন স্টুয়ার্টের গোমড়া মুখ দেখে আইন্সটাইনের মায়া লাগলো। তিনি জনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “বিপর্যয় যে নেমে আসবেই এটা কিন্তু নিশ্চিত না। শুধু সম্ভাবনা আছে। এটা নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা করো না। এমনও হতে কোন সমস্যাই হবে না।”
এতক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, “তুমি আমার কাছে কেন এসেছো বলো। আমি কি মৃত্যুর পর খুব বেশি বিখ্যাত হয়ে গেছি?” হেসে বললেন আইন্সটাইন। জন স্টুয়ার্টও হেসে বলল, “জ্বি স্যার। আপনি কতটা মেধাবী একজন মানুষ তা এখনো মানুষ জানে না। তবে জানবে। আপনি জানলে অবাক হবেন আমাদের বেশিরভাগ আবিষ্কারই আপনার থিওরির উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে আপনার নামে অনেকগুলো ইউনিভার্সিটি হয়েছে।”
“বাহ তাহলে তো বলতেই হয় আমি বিখ্যাত বিজ্ঞানী। তুমি না এলে তো জানতেই পারতাম না।” শব্দ করে হেসে উঠলেন তিনি।
আইন্সটাইনের রসিকতার কথা জন স্টুয়ার্ট অনেক শুনেছে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলো।
“স্যার আপনার কাছে আমি বিশেষ একটা দরকারে এসেছি।”
“বিশেষ দরকার?”
“জি স্যার।”
“বলে ফেলো। শুনছি।”
“১৯৩৯ সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে। আপনাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।”
জন স্টুয়ার্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করে যেতে লাগলো। মানুষের উপর পারমাণবিক বোমা যে সত্যি সত্যিই ফেলা হবে আইন্সটাইন তা বিশ্বাস করতে পারলেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভবিষ্যৎ বাণী শুনে তিনি পুরোপুরি দমে গেলেন। এক সময় অস্পষ্ট কন্ঠে বললেন, “আমি কিভাবে এই যুদ্ধ বন্ধ করবো?”
“১৯৩৯ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর জার্মান একনায়ক এডলফ হিটলার পোল্যান্ডের ভিলুন নগরীতে আক্রমণ করবে। সেই দিয়েই শুরু হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আপনি এর আগেই দুই দেশের সাথে যোগাযোগ করে একটা সমঝোতার চেষ্টা করবেন স্যার।”
জন স্টুয়ার্ট ভেবেছিলো আইন্সটাইন রাজি হবে না। তাকে অবাক করে দিয়ে আইন্সটাইন বললেন, “আর কিছু?”
“খুব ভালো হয় ১৯৩৭ সালের চীন-জাপান যুদ্ধটা বন্ধ করতে পারলে। অনেকে মনে করে এই যুদ্ধই ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণ।”
আইন্সটাইন বললেন, “ঠিক আছে। আমি কথা দিচ্ছি আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। কিন্তু তুমি কিন্তু সমস্যায় পড়তে পারো। আমরা তো বর্তমানে আছি আমাদের কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু একজন টাইম ট্রাভেলার হিসেবে তুমি সমস্যায় পড়তে পারো।”
“আমি জানি স্যার। যেই মুহুর্তে অতীত বদলে যাবে। সেই মুহুর্ত থেকে নতুন একটা টাইম লাইন শুরু হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে পৃথিবীতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিলো। সেই পরিবর্তন না এলে স্বভাবতই ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে পরিবর্তন আসতে পারে। এর জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।”
“নাহ এটা হবে না। ২০০-৩০০ বছর বা তার কম সময় টাইম ট্রাভেল করতে এই সমস্যা ছিলো। এটা ছাড়াও কিন্তু আরও একটা সমস্যা দেখা দিতে পারে।”
“সেটা কী স্যার?”
এবারেও আইন্সটাইন বলতে পারল না। এই সত্যটি বলার সাহস তার নেই।

আইন্সটাইনকে সাথে নিয়ে জন স্টুয়ার্ট সেই বনে ফিরে এলো। পাতার আড়াল থেকে বের করলো সেই ক্যাপসুলটিকে। আইন্সটাইন মুগ্ধ হয়ে দেখলেন হাজার বছর পরের আবিস্কার।
জন স্টুয়ার্ট ক্যাপসুলে ঢোকার আগ মুহুর্তে আইন্সটাইনের সাথে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলো। আর নরম স্বরে বলল, “স্যার আমি একবার আপনাকে জরিয়ে ধরতে চাই।”
আইন্সটাইন কোন কথা বললেন না। বুকে টেনে নিলেন হাজার বছর ভবিষ্যৎ থেকে আসা যুবকটিকে যে কি-না নানা বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও অতীতে এসেছে শুধুমাত্র আদি মানুষের ভালোবাসার টানে।
ক্যাপসুলে ঢোকার ঠিক আগ মুহুর্তে জন স্টুয়ার্ট হাসিমুখে বলল, “স্যার, আমার কথা যেন কেউ না জানে। টাইম ট্রাভেল যে আবিস্কার হয়েছে আপনি আগেই কাউকে জানাবেন না দয়া করে ।”
“আচ্ছা, জানাবো না। কিন্তু তুমি এই ব্যাগে করে কী নিয়ে যাচ্ছো?” ছোট ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে বললেন আইন্সটাইন।
জন স্টুয়ার্ট মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলল, “কিছু গোলাপ নিচ্ছি স্যার। আমার পুরোনো ভবিষ্যতে জেসিকা নামের একটা মেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
জবাব শুনে মুচকি হাসলেন আইন্সটাইন। ছেলেটা ক্যাপসুলের ঢাকনা বন্ধ করে ফেলেছে। স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে তার উচ্ছ্বসিত মুখ দেখা যাচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল আইন্সটাইনের।
তার অল্প সময়ের মধ্যেই ছোট একটা গর্জন করে ক্যাপসুলটি অদৃশ্য হলো।

ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে ফিরতে জন স্টুয়ার্টের কিছুটা ভয় লাগছিলো। নানা শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিলো মনে। স্যার আইন্সটাইনের ভাষ্যমতে যে কোন ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাবনাই রয়েছে।

ক্যাপসুল থেকে বের হয়েই জন স্টুয়ার্টের শঙ্কা কমে এলো। বিজ্ঞান একাডেমি আগের মতোই আছে। চারদিকে চোখ বুলিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। ঐ তো আগের রোবট গুলোই এক মনে কাজ করে যাচ্ছে। কিছুই বদলায়নি। তাকে দেখে একটা রোবট এগিয়ে এলো।
কন্ঠে কৃত্রিম আন্তরিকতা ফুটিয়ে তুলে বলল, “জন স্টুয়ার্ট, তুমি ফিরে এসেছো দেখে আমরা আনন্দিত। সফল অভিযানের জন্য অভিনন্দন তোমাকে।”
‘সফল অভিযান’ কথাটা শুনেই জন স্টুয়ার্ট বুঝে গেল আইন্সটাইন সফল হয়েছেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে দেননি।
জন স্টুয়ার্ট কোন প্রশ্ন করার আগেই রোবটটা বলে যেতে লাগলো, “তুমি অতীতে যাওয়ার কয়েক মিনিট পরই ইতিহাস বদলে গেছে। সকল বই, ক্রিস্টাল এবং অন্যান্য ডকুমেন্টস ফাইল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সব তথ্য মুছে গেছে। তার মানে যুদ্ধটা হয়নি।”
জন স্টুয়ার্ট এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করলো। মনে হলো তার মানব জীবন স্বার্থক হয়েছে।
রোবটটা বলল, “তুমি ফিরে এসেছো এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা আনন্দের সংবাদ। বিজ্ঞান একাডেমির সবেক প্রধান আর্থার লুইস বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন আজ।”
কথাটা শোনা মাত্রই জন স্টুয়ার্ট চমকে উঠলো। মুহুর্তেই তার সব আনন্দ উবে গেল।
“উনি মারা গেছেন? কিভাবে?” কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলো জন স্টুয়ার্ট।
“উনি মারা গেছেন প্রায় ২৫ বছর আগে। বয়স্ক জনিত কারণেই মারা গেছেন উনি।” দ্বিতীয় বারের মতো চমকে উঠলো জন স্টুয়ার্ট।
“পঁচিশ বছর আগে মারা গেছেন উনি! এটা কত সাল?”
“এটা ৩০৭২ সাল জন। তুমি ৪৩ বছর পর ফিরেছো।” ভাবলেশ কন্ঠে জবাব দিল রোবটটি।
জন স্টুয়ার্ট কথা বলতে ভুলে গেল। তার মনে হলো তার পায়ের নিচের মেঝেটা বুঝি কাঁপছে। মনে হচ্ছে তার চারপাশে ঘূর্নিঝড় শুরু হয়ে গেছে আর সে আছে সেই ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে। এরকম কিছু যে হবে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
“কিন্তু হিসেবমতে তো আমার ১০-১২ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসার কথা। সেভাবেই সব সেট ছিলো।”
“হ্যাঁ, বাট তোমার সমীকরণে সামান্য ভুল ছিলো জন। মহা বিজ্ঞানী স্যার আইন্সটাইনের লেখা এক বইতে তোমার কথা উঠে এসেছে। তিনি জানতেন মহাবিশ্বের মোট ভরের পরিবর্তন হওয়ার কারণে সময় নিয়ে একটা গোলমাল হবে।”
জন স্টুয়ার্ট বুঝতে পারলো সেদিন আইন্সটাইন এটা বলতে চেয়েও তাকে বলতে পারেনি।
হঠাৎ জেসিকার কথা মনে পড়লো তার।
“জেসিকা…..” কথাটা শেষ করতে পারলো না জন। তার গলা ধরে এলো।
“ওহ আচ্ছা জেসিকা। উনি আছেন নর্থ জোনে। তুমি যে ফিরে এসেছো তাকে জানাবো?”
“নাহ দরকার নেই। আমিই যাচ্ছি তার কাছে।”

নীল রঙের ছোট্ট বাড়িটা খাড়া পাহাড়ের একদম কিনার ঘেঁষে। নিচেই সমুদ্র‍। বাসা থেকে একটা ওয়াকওয়ে ব্রিজ চলে গেছে সমুদ্রের অনেকখানি ভেতরে।
জন স্টুয়ার্ট ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। ব্রিজের শেষ মাথায় একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে।
জন স্টুয়ার্ট কিছু বলল না। চুপিচুপি জেসিকার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। দীর্ঘ সময় কেউ কোন কথা বলল না।
নিরবতা ভাঙলো জেসিকা, “সেদিন তুমি অতীতে যাওয়ার পর আমরা সবাই অপেক্ষা করে রইলাম। তুমি অতীতে যাওয়ার কিছুক্ষণের ভেতর ইতিহাস বদলে গেলেই আমরা বুঝে যাই তুমি সফল হয়েছো। কিন্তু আমাদের ভয় শুরু হয় কারণ ১০ মিনিট শেষ হলো অথচ তুমি ফিরলে না। ১ ঘন্টা পার হলো। ২ ঘন্টা, ৩ ঘন্টা। শেষমেশ আর্থার লুইস বললেন তুমি আর ফিরবে না। সবাই আশা ছেড়ে দিলো। আমি রোজ একবার করে ল্যাবে যেতাম। জিজ্ঞেস করতাম তুমি ফিরেছো কিনা। বছরের পর বছর এভাবেই চলতে লাগল। আমি রোজ যেতাম আর শুনতে পেতাম তুমি ফিরে আসোনি। একসময় ক্লান্ত হয়ে গেলাম আমি। গত দুই বছর ধরে খোঁজ নিচ্ছিলাম না। আর আজই তুমি ফিরে এলে।” খুব স্বাভাবিক ভাবেই কথাগুলো বলল সে। জন স্টুয়ার্ট কোন কথা বলল না। চুপ করে রইলো।
জেসিকা বলল, “তুমি চুপ করে আছো কেন? কথা বলবে না?”
এবারেও নিশ্চুপ জন স্টুয়ার্ট।
জেসিকা বলল, “আমার জন্য মন খারাপ করো না। তুমি এখন পুরো যৌবনে আছো। সেই সময়টা আমি বহুদিন আগেই পার করে এসেছি। তোমার উচিত হবে বিজ্ঞান একাডেমি থেকে অনুমতি নিয়ে তোমার বয়সী কাউকে বিয়ে করে নেয়া।” কথাগুলো বলার সময় জেসিকার গলা ধরে এলো।
জন স্টুয়ার্ট সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন সে কথা বলতে ভুলে গেছে।
“তুমি কোন কথাই বলবে না? শুধু দেখা করতে এসেছো?” নরম স্বরে বলল জেসিকা।
জন স্টুয়ার্ট এবারে তাকালো জেসিকার দিকে। পেছনে থাকা হাত সামনে আনলো সে। তার দু’হাত ভর্তি তাজা গোলাপ। গোলাপগুলো জেসিকার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “ফুলগুলো তোমার জন্য। ভালোবাসাকে কখনোই সময়ের স্রোতে আটকে রাখা সম্ভব না। সেই শক্তি প্রকৃতিরও নেই।”
এতক্ষণ স্বাভাবিক থাকলেও এবারে জেসিকার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। কাঁদতে থাকলো জন স্টুয়ার্টও।
তার মনে হলো এই সামান্য কান্নার বিনিময়ে সে হিরোশিমার লক্ষ্য শিশুর কান্না মুছে দিতে পেরেছে। ভেজা চোখের কল্পনাতেই সে অযুত-কোটি শিশুর মুখে হাসি দেখতে পেল। যেই হাসিতে ঝরে পড়ছে কেবলই নির্মল আনন্দ। ( সমাপ্ত)

#পুরোনো_ভবিষ্যৎ

~মারুফ আল আমিন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top